ভ্রমণ আমাদের জীবনের একটি অংশ। ভ্রমণ আপনাকে দৈনন্দিন রুটিন থেকে বের করে নতুন পরিবেশ এবং নতুন অভিজ্ঞতার সাথে মেলায়। এটি আমাদের শরীর ও মনকে পুনরায় গড়ে তোলে।
বাঙালির বেড়াতে যাওয়ার কোনও উপলক্ষ লাগে না। হাতে কয়েক দিনের ছুটি পেলেই মন বেড়াতে যাওয়ার জন্য নেচে ওঠে। কেউ পাড়ি দেন পাহাড়ে কিংবা কারও পছন্দ জঙ্গল। অনেকেই আবার সমুদ্রপাড়ে কয়েক দিন কাটিয়ে আসতে চান।

একঘেয়ে জীবন থেকে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে বেড়িয়ে এলে শরীর এবং মন ঝরঝরে হয়ে ওঠে। তবে এক বার গন্তব্যে পৌঁছে গেলে আর কোনও চিন্তা থাকে না। তবে বেশি দূরে গেলে অনেক সময় নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। একে অপরিচিত জায়গা, তার উপর সেখানকার মানুষজন, সংস্কৃতি সব কিছুই আলাদা। ফলে কোনও সমস্যা হলে বে়ড়ানোটাই মাটি হয়ে যাবে। বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ নিরাপদে উপভোগ করতে চাইলে কয়েকটি কাজ আগে থেকে সেরে রাখা জরুরি।
জায়গাটি সম্পর্কে ভাল করে জেনে নিন:ঘুরতে কোথায় যাবেন সেটা আগেই ঠিক করে নিন। আবহাওয়া বুঝে জায়গা নির্বাচন করুন। কতদিন থাকবেন সেভাবে চিন্তা করে ব্যাগ গুছিয়ে নিবেন। কাদের সঙ্গে যাবেন সে অনুযায়ী জায়গা নির্বাচন করাই উত্তম। যেখানে বেড়াতে যাবেন বলে ঠিক করেছেন, বাড়ি বসেই সেই জায়গা সম্পর্ক যতটা জানা সম্ভব জেনে নিন। সেখানকার রাস্তাঘাট, উল্লেখযোগ্য স্থান, থানা, হাসপাতাল সম্পর্কে জেনে রাখুন। দরকারে কাজে লেগে যেতেই পারে।
বাসায় সব তথ্য দিয়ে যান: কোথায় যাচ্ছেন, কত দিন থাকছেন, কবে ফিরছেন, এই প্রাথমিক তথ্যগুলি পরিজনদের সঙ্গে সকলেই ভাগ করে নেন। কিন্তু এগুলিই যথেষ্ট নয়। ট্রেন কিংবা বিমান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য, বেড়াতে গিয়ে কোন হোটেলে থাকছেন এমন বেশ কিছু তথ্যও প্রিয়জনদের জানিয়ে রাখা ভাল।

দরকারি কাগজপত্রের ফটোকপি সঙ্গে রাখুন: ভোটার আইডি কার্ড-এর মতো অত্যন্ত জরুরি কাগজপত্রগুলির ফটোকপি করিয়ে সঙ্গে রাখুন। খুব দরকার না পড়লে আসলগুলি রাখার ঝুঁকি নেবেন না। কোনও ভাবে একটি কাগজ হারিয়ে গেলে ফিরে এসে মুশকিলে পড়বেন আপনিই।
কোথায় থাকবেন: বেড়াতে গেলে কোথায় থাকবেন তার ওপর আপনার ভ্রমণের অনেক আনন্দ নির্ভর করে। আপনার বাজেট, আপনার ভ্রমণ সঙ্গী কতজন, কেমন পরিবেশে থাকতে চান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন এই বিষয়গুলো ভেবেই কোথায় থাকবেন তার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যাওয়ার আগে অবশ্যই খুঁজ নিয়ে যাওয়ায় হবে বুদ্ধিমানের কাজ। অনলাইনে হোটেল বুক করার সময়ে যতটুকু সম্ভব বিষয়টি নজরে রাখুন। বাকিটা হোটেলে পৌঁছেই যাচাই করতে হবে। রিসেপশনের ফোন নম্বরটি ফোনে সেভ করে রাখুন। যাতে যে কোনও দরকারে হোটেল-কর্মীদের ডাকতে পারেন।
খাবার ও পানি: বেড়াতে গেলে বাসা থেকে খাবার কিংবা পানি বয়ে নেওয়া তো আর সম্ভব নয়। কিন্তু স্বাস্থ্য-সচেতন মানুষ হিসেবে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে অবশ্যই পানি খাওয়ার আগে নিরাপদ কি না, নিশ্চিত হয়ে নিন। অতি উৎসাহী হয়ে ঝরনা, লেক, সমুদ্র বা অন্য যেকোনো উৎস থেকে চট করে পানি মুখে দেওয়া উচিত নয়।

দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকাও উচিত নয়। দুর্গম এলাকায় গেলে সঙ্গে কিছু শুকনা খাবার ও পানি রাখুন। কম পরিমাণ খাবার বহন করলেও সেটির ক্যালরি এবং পুষ্টিমান যাতে পর্যাপ্ত থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। খেজুর রাখতে পারেন, মিষ্টি বিস্কুটও রাখা যায়। ডায়াবেটিসের রোগীর ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু বাড়তি খাবার রাখুন।
অতিরিক্ত ঝাল কিংবা মসলা দেওয়া খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। যে খাবারে অভ্যস্ত নন, সেই খাবার খুব বেশি না খাওয়াই ভালো। ভিন্ন ধরনের রান্না অল্প খাওয়া যেতে পারে। অস্বাস্থ্যকর খাবার যতই মুখরোচক হোক, এড়িয়ে চলা ভালো।অনেকের খাবারদাবারের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। অল্প সময়ের জন্য বেড়াতে গিয়ে সেগুলো না মেনে চললে তেমন ক্ষতি হবে না, এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা।
আবাসিক হোটেলের কক্ষের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করুন অবশ্যই। আলো-বাতাস প্রবেশ করে, এমন কক্ষ বেছে নেওয়া ভালো।
শরীরের ওপর খুব চাপ সৃষ্টি করে অল্প সময়ে অনেক জায়গা ঘুরে আসার প্রবণতা ভালো নয়। অমুক জায়গায় সবাই ছবি তোলে বলে আমাকেও সেখানে যেতেই হবে এমন ভাবনা মনে ঠাঁই দেবেন না। অত্যন্ত দুর্গম এলাকার দুর্লভ সৌন্দর্য দেখার আশায় নিজের জীবন ও সুস্থতাকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না। ঝোপ-জঙ্গলে ঢোকার ক্ষেত্রেও সাবধান। বেড়াতে গিয়ে অবশ্যই সেখানকার স্থানীয় দিকনির্দেশনা মেনে চলুন।
বেড়াতে গিয়ে মনের যত্ন নিতে ভুলবেন না। হাসি-আনন্দে সময় কাটান। বিষণ্ণতাকে জায়গা দেবেন না। ব্যস্ততাকে ছুটি দিন। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে সময় কম দিন, সম্ভব হলে ছুটি নিন সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম থেকেও। কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটান। মন ভালো থাকবে।
যেখানে মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব,সেখানে মশার কামড় থেকে বাঁচতে কিছু আলাদা ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। ফুলহাতা পোশাক মশার কামড় থেকে কিছুটা সুরক্ষা তো দেবেই। এ ছাড়া মশা প্রতিরোধী সামগ্রী ব্যবহার করুন। তবে শিশুদের এমন সামগ্রী দেওয়ার আগে জেনে নিন, সেটি শিশুর উপযোগী কি না। কিছু কিছু পণ্য তিন বছর বয়স হওয়ার আগে প্রয়োগ করাটা ঝুঁকিপূর্ণ।
রোগবালাই ও ওষুধ:
ভ্রমণের সময় প্রাথমিক চিকিৎসার টুকিটাকি রাখুন নিজের সঙ্গেই। আর যাদের নিত্যদিনের তালিকায় ওষুধ রয়েছে তাদের অবশ্যই সেসব সঙ্গে নিতে হবে।
অনেকেরই নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। কোনো ওষুধ রোজকার, কোনোটি সাপ্তাহিক। কোনোটি আবার প্রয়োজন হয় মাঝেমধ্যে। ট্যাবলেট, ক্যাপসুল তো বটেই, ইনহেলার বা ইনসুলিনের প্রয়োজন হয় অনেকের। এই ওষুধগুলো সঙ্গেই রাখুন। কিছু ওষুধ (যেমন ইনসুলিন) নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয়। সেটির ব্যবস্থাও করতে হবে অবশ্যই। দেশের বাইরে গেলেও ওষুধ সঙ্গে রাখা ভালো, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রও সঙ্গে নিয়ে নিন দেশের বাইরে যাওয়ার সময়।
যাত্রার আগে ভরপেট না খাওয়াই ভালো।
বেড়াতে গিয়ে আপনি কোনো জায়গা অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন রেখে আসছেন না কিংবা পরিবেশের ক্ষতি করছেন না,এগুলোও খেয়াল করুন। এটি আপনাকে মানসিক প্রশান্তি দেবে।